মানুষ হওয়ার অনেক যন্ত্রণা, সব দেখা যায় না সব শোনা হয় না। তবু দেখতে ইচ্ছে করছে রাতের রাজপথ, অলি গলির অন্ধকারের জীবন যাপন। কি করা যায়??? একটা কুকুরের মাঝে যদি ঢুকে যাওয়া যেত প্রেতাত্মা হয়ে কি মজাই না হত!! আচ্ছা একটু কল্পনায় ঢুকেই দেখি না কি হয়? কুকুরের দেহে মানুষের চোখ…

সন্ধ্যে রাত

জিব বের করে হাঁটছি আমি রেললাইনের পাড় ধরে, বস্তির কিনারে। একটি শিশুর কান্নার ধ্বনি ভেসে আসে কুকুরের কানে; মা রে এ এ এ, দুইটা ভাত দে মা। হালকা শোনা যায় মায়ের ফুঁপিয়ে কান্না – বাজান রে, আইজকা ভিক্ষা পাই নাই, চাইল জুডে নাই; সাবেগো ফালাইয়া দেওয়া রুডির টুকরা একটা আনছি, আইজকা এইডা খাইয়া পেট ভইরা পানি খা, ঘুম যা বাজান।

মধ্য রাত

বস্তির কোনার দিকের একটি ঘর – নারী কন্ঠের কিছু অসংলগ্ন ধ্বনি কানে ভেসে আসে, সাথে যেন কুকুরের মত জিহ্বা বের করা হাঁপানোর শব্দ; শরীরের সাথে চলছে শরীরের যুদ্ধ, রমণের আদি শীৎকার ধ্বনি থেমে যায়, কিছু গালাগালি পুরুষ কুকুরটার। নারী কন্ঠের আর্তনাদ – ও সাব……দুইশ টেকা দেওয়ার কতা কইয়া লইয়া আইছেন, অহন কম দিতাছেন কেন? যাহ ছেমরি ভাগ, কুকুরের ঘেউ ডাক ওঠে, বেড়ার দরজা খুলে নত মুখে একটি কিশোরী বের হয়ে আসে, বিধ্বস্ত……… সাথে করে বয়ে নিয়ে কিছু নোংরা বীর্য। হয়তো বীজ বপন হয়েছে আজই আরেকটি অনাগত নতুন সন্তানের, কিশোরীর পেটে। ভদ্র সমাজে দেয়া হবে যার নাম – জারজ সন্তান…………

হাটতে হাটতে গলির মুখে আসি। দু তিনটি কুকুর শুয়ে আছে রাস্তার ধারে, নতুন মুখ দেখে ঘেউ করে ওঠে, যেন তাদের স্থান দখল করতে এসেছি, আমিও যেন ঘেউ করে বলি – ভাইয়েরা আমার, আমি এ পাড়ার নতুন অতিথি, শুধু তোমাদের দেখতে এসেছি; শুনে যেন, বুঝে তারা জাতি ভাইয়ের কথা, আবার চুপ করে শুয়ে থাকে……

গলির মুখে দু তিনটি ছেলে কি জানি নিয়ে হাসাহাসি করছে। একজন প্যান্টের জীপার খোলে, পরম আনন্দে ল্যাম্পপোস্টে জল ঢালে, যেন গাছে পানি দিচ্ছে। সিগারেট ঝোলা মুখে তৃপ্তির হাসি, আহহ…, যেন বড় একটা চাপ গেল……

একটা রিক্সা আসছে। হঠাৎ করেই যেন সাড়া পড়ে গেল তাদের মাঝে, কিছু ফিসফিসানি। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হঠাৎই তাদের হাতে ছুড়ি ঝিক করে ওঠে। বোরখাওয়ালি এক মহিলা সাথে আট দশ বছরের বালক একটি, রাস্তায় শুয়ে থাকা কুকুরগুলো হঠাতই যেন গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে মানুষরূপী ওই কুকুরগুলোর সাথে সাথে। হা হা করে রিক্সার ওপর চড়াও হয়, দুজনকে টেনে হিঁচড়ে নামায় রিক্সা থেকে; রিক্সাওয়ালা ভয়ে থরথর করে কাঁপে। একজন বোরখায় টান দেয়, এখানে ওখানে হাতরায়, বোনাস যদি কিছু পায় – যৌবন নামক কোন অমৃত। একজন নাক সিটকায়, ধুর শালার বুড়ি একটা জুটছে, কপালডাই খারাপ আইজকা, বলে কালো হাতব্যাগটা ছিনিয়ে নেয়, অবুঝ ছেলেটা বাধা দিতে চায়, ওমনি ছোঁড়া একটা ঝিলিক দিয়ে ওঠে – ছোঁড়া ছেলেটার পেটে ঢোকে, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে, ল্যাম্পপোস্ট লাল হয়ে যায় রক্তের ছিটায়……

হৈ হৈ করে ছেলেগুলো দৌড়ে গলির ভেতর ঢুকে যায়। রিক্সাওয়ালা পরম মমতায় ছেলেটিকে কোলে তুলে রিক্সায় ওঠায়, রিক্সা চলতে থাকে; ধীরে ধীরে দৃষ্টিসীমানা থেক অদৃশ্য হয়ে যায়………

কুকুরগুলোর মধ্যে থেকে একটি এগিয়ে যায় ল্যাম্পপোস্টের দিকে, লেগে থাকা তাজা রক্ত জিহ্বায় চাটে; তারপর যেন ঢেকুর তুলে আবার সেখানেই শুয়ে পড়ে।

নাহহ…… কুকুর জীবন আর ভালো লাগছে না, বড় নোংরা এই রাতের শহর; অনেক নোংরামির সাথে হলো পরিচয়, কেন যে দেখতে গেলাম এতসব রাতের আঁধারে? মনটা বড়ই খারাপ হয়ে ওঠে।

শহুরের রাতের অনেক রূপ দেখে ফিরে এসেছি নিজের মাঝে আবার মানুষের রূপে; মনের মাঝে একটা বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে – মানুষ আর মানুষ নামের ওই কুকুরগুলোর মাঝে পার্থক্য কোথায়?